দেশভাগের অজানা ইতিহাস: সীমারেখার আড়ালে রাজনৈতিক কূটকৌশল:

মোঃ সাইদুর রহমান সাধু, লেখক ও কলামিস্ট

১৯৪৭ সালের দেশভাগ উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি। প্রায় ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হলেও এর পেছনে ছিল জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ, কৌশলগত স্বার্থ এবং নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।

১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা দেয় যে ১৯৪৭ সালের আগস্টের মধ্যেই ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেওয়া হবে। তখন বাংলার নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর, আসামের সিলেট অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরসহ অনেক এলাকাই ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে সাধারণ ধারণা ছিল, এসব অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে।

দেশভাগের সীমারেখা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সাইরিল রেডক্লিফকে। ভারত সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। রেডক্লিফ কমিশনে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করলেও রেডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড প্রকাশিত হয় ১৭ আগস্ট। ফলে ১৪ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত সীমান্তবর্তী বহু অঞ্চলের মানুষ নিশ্চিতভাবে জানতেন না তারা কোন দেশের নাগরিক হতে যাচ্ছেন।

মুর্শিদাবাদ, মালদহ, নদীয়া এবং দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। কারণ তখন ধারণা করা হচ্ছিল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় এসব অঞ্চল পাকিস্তানের অংশ হবে। কিন্তু ১৭ আগস্ট সীমারেখা ঘোষণার পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং বহু মানুষ জানতে পারেন যে তারা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

নদীয়া জেলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এর ধর্মীয় ও কৌশলগত গুরুত্ব ছিল বিশেষ। মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের জন্মস্থান হিসেবে নদীয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে বিভিন্ন হিন্দু নেতা ও সংগঠন এটিকে ভারতের অংশে রাখার দাবি জানায়।

অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যুক্তি দেন যে নদীয়া ভারতের অংশে না থাকলে কলকাতার সঙ্গে উত্তর ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। এসব বিবেচনায় পরবর্তীতে নদীয়ার বড় অংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

দিনাজপুর জেলা বিভক্ত হয়ে একাংশ ভারত এবং অন্যাংশ পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত হয়। একই সময়ে পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর নিয়েও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

গুরুদাসপুর ভারতের হাতে থাকলে কাশ্মীরের সঙ্গে স্থলপথে যোগাযোগ সম্ভব হবে—এমন ধারণা তৎকালীন কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে ছিল। অন্যদিকে দিনাজপুরের কিছু অংশ পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে সীমারেখা নির্ধারণে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়।

মুর্শিদাবাদ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও ভারতের অংশ হয়। এর অন্যতম কারণ হিসেবে কলকাতা বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং গঙ্গা-হুগলি নদী ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ভারতীয় নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করত, মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের অংশ হলে ভবিষ্যতে কলকাতার সঙ্গে উত্তর ভারতের যোগাযোগ এবং নদীপথের স্বাভাবিক প্রবাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একইভাবে মালদহ জেলার বড় অংশও ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

১৯৪৭ সালে সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ ভোটার পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেওয়ায় সিলেটের বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত হয়। তবে করিমগঞ্জ মহকুমা ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়।

করিমগঞ্জের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ নিয়ে তৎকালীন সময়ে নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক আলোচনা ছিল। শেষ পর্যন্ত সীমারেখা নির্ধারণের সময় প্রশাসনিক, ভৌগোলিক ও যোগাযোগগত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

দেশভাগের ফলে শুধু মানচিত্রই বদলায়নি; বদলে গিয়েছিল কোটি মানুষের জীবন। রাতারাতি মানুষ হয়ে যায় উদ্বাস্তু। ভিটেমাটি, সম্পদ, আত্মীয়স্বজন—সবকিছু ছেড়ে নতুন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় লাখো মানুষ।

হিন্দু, মুসলমান, শিখ—সব সম্প্রদায়ের মানুষই এই বিভক্তির শিকার হয়। সীমান্তের দুই পাশে শুরু হয় উদ্বাস্তু স্রোত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং দীর্ঘ মানবিক সংকট।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ছিল শুধু দুটি রাষ্ট্রের জন্ম নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কৌশলগত স্বার্থ, ধর্মীয় আবেগ এবং উপনিবেশিক প্রশাসনের জটিল বাস্তবতার ফল। নদীয়া, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর কিংবা করিমগঞ্জ—প্রতিটি অঞ্চলের ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে একটি সীমারেখা কখনও কখনও লক্ষ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

দেশভাগের সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব আজও ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।