সিংড়ায় একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরি সেচ বন্ধ, অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি
নাটোরের সিংড়ায় চলনবিলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন বোরো ধানের সোনালি স্বপ্ন। ঠিক এই সময়ে কৃষকের সেই স্বপ্নে হানা দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চোরচক্র। চলতি মৌসুমে বিএডিসির ১১টিসহ রেকর্ড ৯৬টি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এতে কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, সেচ বন্ধ হয়ে মাঠের ফসল শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মৌসুমের এই সন্ধিক্ষণে ট্রান্সফরমার চুরির আতঙ্ক চলনবিলের হাজার হাজার কৃষকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। প্রশাসন ও বিদ্যুৎ অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রতিকার না পেয়ে এখন নিজেরাই রাত জেগে মাঠ পাহারা দিচ্ছেন দল বেঁধে। এর পরও থামানো যাচ্ছে না চোরচক্রকে। দ্রুত এই চক্রকে গ্রেপ্তার না করলে চলনবিলের কৃষি অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
মাঠের পর মাঠ এখন চোরদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগী কৃষকদের তথ্যমতে, চুরির কারণে থমকে গেছে কয়েক হাজার বিঘা জমির সেচকাজ। লাড়ুয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাইয়ুম জানান, বিএডিসির গভীর নলকূপের মাধ্যমে ১৮০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। গত ২১ মার্চ এক রাতেই তাঁর তিনটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়, যার বাজারমূল্য দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘টাকা জোগাড় করতে দেরি হওয়ায় ভরা মৌসুমে ১৬ দিন পানি দিতে পারিনি। এখন চুরির ভয়ে রাত জেগে মাঠ পাহারা দিচ্ছি।
হুলহুলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, এক রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। গত ২৮ মার্চ হুলহুলিয়া মাঠ থেকে তাঁর নিজেরসহ আব্দুল লতিফ, বাবু তালুকদার, আফজাল ফকির, মোজাম্মেল ও শামিম সোনারের মোট পাঁচটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
তিনি বলেন, এক রাতেই পুরো মাঠ অন্ধকার করে দিল চোরেরা। সেচ দিতে না পেরে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে।’
চৌগ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল আক্ষেপ করে বলেন, ২৩ মার্চ তাঁর ৪৫ হাজার টাকা মূল্যের ৫ কেভির ট্রান্সফরমারটি চুরি হয়েছে। একই মাঠ থেকে রনি সরদারেরও একটি চুরি হয়েছে। থানায় অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি তারা।
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ (সিংড়া জোনাল অফিস) সূত্রে জানা যায়, ৫ কেভি প্রতিটি ট্রান্সফরমারের দাম ৪৪ হাজার এবং ১০ কেভির মূল্য ৮৬ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ৯৬টি ট্রান্সফরমারের দাম প্রায় অর্ধকোটি টাকা।
ডিজিএম সিদ্দিকুর রহমান জানান, পাঁচ হাজার ৫০০ সেচ সংযোগের মাধ্যমে এই উপজেলায় চাষাবাদ হচ্ছে। চুরির বিষয়ে সচেতনতামূলক লিফলেট ও মাইকিং করা হলেও চোর ধরা পড়ছে না বা চুরি থামছে না।
বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী মানিক রতন জানান, বিএডিসি পরিচালিত চার কৃষকের ১১টি বড় (১০ কেভি) ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির দাম ৮৬ হাজার টাকা। প্রতিটি ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছে।
যৌথ পাহারা ও পুলিশের বক্তব্য
চুরির ভয়ে চলনবিলের অনেক গ্রামেই এখন কৃষকরা লাঠি ও টর্চলাইট নিয়ে ‘যৌথ পাহারা’র ব্যবস্থা করেছেন।
সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ স ম আব্দুন নূর বলেন, চুরির ঘটনা ঘটলেও লিখিত অভিযোগকারীর সংখ্যা কম। তবে হিজলীসহ যেসব এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখানে চুরি কমেছে। চোর ধরতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।